দীপু মনির নেতৃত্বে গড়ে উঠেছিল জিপিএ ৫ সিন্ডিকেট

টাকায় বিক্রি হতো জিপিএ ৫, আর ফেল থেকে হয়ে যেত পাস—এমন অভিযোগে শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনির নেতৃত্বে গড়ে ওঠা এক শক্তিশালী সিন্ডিকেটের কথা উঠে এসেছে। পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে মেধার পরিবর্তে জিপিএ স্কোর দিয়ে শিক্ষার্থীদের যোগ্যতা নির্ধারণ করা হতো। ফলস্বরূপ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা চলত, কতজন শিক্ষার্থী জিপিএ ৫ পেল তা নিয়ে।


২০১৮ সালে দীপু মনি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নেওয়ার পর জিপিএ ৫ কেনাবেচার চক্রটি সক্রিয় হয়ে ওঠে। শিক্ষামন্ত্রী, বোর্ড চেয়ারম্যান, সচিব এবং বিভিন্ন কলেজের প্রধানরা এই চক্রের সাথে জড়িয়ে পড়েন। অভিযোগ ওঠে, টাকা দিলে সহজেই জিপিএ ৫ পাওয়া যেত এবং অনেক অনুত্তীর্ণ শিক্ষার্থীও বোর্ড পরীক্ষায় কৃতকার্যের স্বাদ নিতেন। তদন্তে জানা যায়, এই লেনদেনের পরিমাণ দেড় লাখ থেকে তিন-চার লাখ টাকাও হতে পারে।


দীপু মনির শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বকাল, ২০১৮ থেকে ২০২৩ পর্যন্ত, জিপিএ ৫ বিক্রির মাধ্যমে শিক্ষা বোর্ডের একটি চক্র কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। এক সময়ের প্রভাবশালী বোর্ড সচিব ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যানকেও পাশ কাটিয়ে সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন। ঢাকায় উপপরীক্ষা নিয়ন্ত্রক নিজেই দেন-দরবার করে টাকার অঙ্ক মীমাংসা করতেন। ঢাকার আশপাশের বিভিন্ন স্কুলের প্রধান শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের রোল ও রেজিস্ট্রেশন নম্বর দিয়ে জিপিএ ৫ বিক্রির জন্য লেনদেন করতেন।


২০২৪ সালের ৫ জানুয়ারি আওয়ামী লীগের নির্বাচনের পর দীপু মনি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব না পাওয়ায় সিন্ডিকেট দুর্বল হতে শুরু করে। তবে ২০১৮ ও ২০১৯ সালে জিপিএ ৫ বিক্রির তথ্য ফাঁস হতে শুরু করে। উত্তরার বিভিন্ন স্কুল-কলেজের প্রধানদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠে। ওই সময়ে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান ছিলেন অধ্যাপক জিয়াউল হক। 


জিপিএ ৫ বিক্রির মূল হোতা ছিলেন শিক্ষা বোর্ড সচিব শাহেদুল খবির চৌধুরী এবং উপপরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অদ্বৈত কুমার রায়। তারা প্রকাশ্যে জিপিএ ৫ কেনাবেচায় জড়িত ছিলেন এবং শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনির লোক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। 


অভিযোগ রয়েছে, উত্তরার বিভিন্ন স্কুল ও কলেজ প্রধান অভিভাবকদের সাথে তিন লাখ টাকায় জিপিএ ৫ পাইয়ে দেয়ার চুক্তি করতেন। করোনার আগের বছরে, ২০১৯ সালের এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষায় তারা কয়েক কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর শিক্ষা বোর্ড থেকে তদন্ত করা হয় এবং সত্যতা পাওয়ায় উত্তরার ন্যাশনাল পাবলিক কলেজ ও দ্য ব্রিলিয়ান্ট কলেজের পাঠদান কার্যক্রম স্থগিত করা হয়।


শিক্ষা বোর্ডের একটি কর্মকর্তা জানিয়েছেন, জিপিএ ৫ বিক্রির মূল হোতা অদ্বৈত কুমার রায়কে ফরিদপুরের রাজেন্দ্র কলেজে বদলি করা হলেও তিনি সেখানে ক্লাস নিতে পারেননি। পরবর্তীতে তিনি বিদেশে চলে যান। এদিকে শাহেদুল খবিরের বিরুদ্ধেও কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি, বরং তিনি মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদফতরে লোভনীয় পদে নিয়োগ পেয়ে যান। 


এভাবে শিক্ষা ব্যবস্থায় এত বড় অনিয়ম চলতে থাকলেও, দিপু মনির নেতৃত্বাধীন চক্রের বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি, যা বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার জন্য একটি ভয়াবহ সংকট।