বাংলাদেশে সংস্কার কমিশনগুলোর প্রস্তাবনা: সংবিধান, নির্বাচন, জনপ্রশাসন ও পুলিশে বড় ধরনের পরিবর্তন
বাংলাদেশে অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে গঠিত বেশ কয়েকটি ‘সংস্কার কমিশন’ সংবিধান, নির্বাচন ব্যবস্থা, জনপ্রশাসন এবং পুলিশ ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনার জন্য কাজ শুরু করেছে। বর্তমানে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে সংবিধান এবং নির্বাচনি সংস্কার। এসব সংস্কারের মাধ্যমে দেশটির শাসন ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী ও কার্যকর করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
সংবিধানে কী পরিবর্তন আসতে পারে?
সংবিধান সংস্কার কমিশন পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিল, আনুপাতিক ভোটিং, দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট সংসদ চালু, প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা কমানো এবং অন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবনা দিয়েছে। কমিশন এও জানিয়েছে, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার বিষয়েও কিছু প্রস্তাবনা এসেছে। পাশাপাশি, প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য আনা, প্রাদেশিক সরকার ব্যবস্থা চালু করা এবং একজন ব্যক্তির জন্য প্রধানমন্ত্রী পদে দুই মেয়াদের বেশি থাকা নিষিদ্ধ করার বিষয়ে আলোচনা চলছে।
সংবিধান সংস্কার কমিশনের প্রধান অধ্যাপক আলী রীয়াজ জানিয়েছেন, কমিশন চেষ্টা করছে যেন প্রস্তাবনাগুলো একে অপরের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয় এবং পরস্পরবিরোধী না হয়। তবে রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্যের ওপর এই সংস্কারের সফলতা নির্ভর করবে।
নির্বাচন ব্যবস্থায় পরিবর্তন:
নির্বাচন কমিশন নির্বাচনী ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তনের প্রস্তাব দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে স্থানীয় নির্বাচনে দলীয় প্রতীক ব্যবহার না করা, ইভিএম বাতিল, প্রবাসীদের জন্য ভোটের বিধান চালু এবং নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের আইন সংশোধন। কমিশন মনে করছে, এসব সংস্কার বাস্তবায়িত হলে নির্বাচন ব্যবস্থা আরও স্বচ্ছ এবং সুষ্ঠু হবে।
কমিশন প্রধান বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘‘নির্বাচন কমিশনকে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দিতে আইনি সংস্কার প্রয়োজন।’’ তিনি আরও জানান, ভোটার তালিকা প্রস্তুতি, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা এবং নির্বাচনী অপরাধ বন্ধে আইন সংস্কারের বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
পুলিশ সংস্কার:
পুলিশি কাঠামো এবং কর্মকাণ্ডে সংস্কারের জন্যও প্রস্তাবনা এসেছে। পুলিশ সংস্কার কমিশন আইনি কাঠামো সংস্কারের পাশাপাশি, পুলিশের জবাবদিহিতা এবং পেশাদারি দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য কাজ করছে। কমিশন জানিয়েছে, রাজনৈতিক পরিচয় দেখে পুলিশ ভেরিফিকেশনের কারণে বৈষম্য তৈরি হয়, এবং এই বিষয়টি বাদ দেওয়ার সুপারিশ করা হবে।
কমিশন প্রধান সরফ রাজ হোসেন জানান, ‘‘আমরা পুলিশের আইনি কাঠামো সংস্কারের প্রস্তাব দেব, যাতে পুলিশ জনগণের প্রতি আরও দায়বদ্ধ ও পেশাদার হয়।’’
জনপ্রশাসনে পরিবর্তন:
জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনও সরকারের চাকরি ও প্রশাসনিক কাঠামোর মধ্যে পরিবর্তন আনতে কাজ করছে। কমিশন সদস্যরা জানিয়েছেন, প্রশাসনে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি এবং পক্ষপাতিত্ব বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য মতামত সংগ্রহ করা হচ্ছে। কমিশন জনপ্রশাসনে কাঠামোগত পরিবর্তন এবং জনবান্ধব প্রশাসন গড়ে তোলার উপর গুরুত্ব দিচ্ছে।
কমিশনের সদস্য মেহেদী হাসান বলেন, ‘‘জনপ্রশাসনে কাঠামোগত সংস্কারের পাশাপাশি, জনগণের প্রতি প্রশাসনের দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করতে আমরা কাজ করছি।’’
সংস্কারের বাস্তবায়ন:
সব সংস্কার কমিশন আগামী ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে তাদের চূড়ান্ত প্রস্তাবনা সরকারের কাছে পেশ করবে। এরপর সরকারের পক্ষ থেকে এসব প্রস্তাবনা রাজনৈতিক দলের সাথে আলোচনা করে চূড়ান্ত করা হবে। তবে, রাজনৈতিক ঐকমত্যের অভাবে কিছু সংস্কার বাস্তবায়ন নিয়ে সংশয় রয়ে গেছে।
কমিশনগুলো আশা করছে, জনগণের মতামতের ভিত্তিতে সংস্কারের প্রস্তাবগুলো চূড়ান্ত করা হবে এবং তা যদি যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হয়, তবে দেশের শাসন ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী হবে। তবে রাজনৈতিক সমঝোতার অভাব থাকলে অনেক সুপারিশই শেষ পর্যন্ত কার্যকর নাও হতে পারে।
বাংলাদেশে বর্তমানে কয়েকটি সংস্কার কমিশন কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে, যার লক্ষ্য দেশের সংবিধান, নির্বাচন ব্যবস্থা, জনপ্রশাসন এবং পুলিশ ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনা। তবে, এই সংস্কারগুলো কার্যকর করতে রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্য এবং জনগণের সমর্থন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সংস্কার প্রস্তাবগুলো চূড়ান্ত করার পর দ্রুত সময়ের মধ্যে নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি নেওয়া হবে।


2 Comments
প্রশংসনীয় উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে!!!!
ReplyDeleteGood Initiative.
ReplyDelete