Editors Choice

3/recent/post-list

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে দ্রুত সংস্কারের প্রয়োজন: করণীয় ও পরামর্শ

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে দ্রুত সংস্কারের প্রয়োজন: করণীয় ও পরামর্শ


বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত এখন এক সংকটময় মুহূর্তে দাঁড়িয়ে। বিদ্যুৎ সরবরাহের ক্রমাগত ঘাটতি, উচ্চ বিল, এবং জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরতা কমানোর জন্য দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। বর্তমান পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে সরকারের সংশ্লিষ্ট খাতে কিছু বড় ধরনের পরিবর্তন ও সংস্কার প্রয়োজন, যার মধ্যে রয়েছে বিদ্যুৎ খাতে দুর্নীতি প্রতিরোধ, কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণ, এবং সবুজ শক্তির প্রতি গুরুত্ব দেওয়া।

১. বিদ্যুৎ খাতে দুর্নীতি ও অপচয় বন্ধ

প্রথমত, বিদ্যুৎ খাতে বিদ্যমান দুর্নীতি ও অপচয় ঠেকাতে সরকারের উচিত দ্রুত *বিশেষ দায়মুক্তি আইন* বাতিল করা এবং *ক্ষমতাশীল দুর্নীতিবাজদের* আইনের আওতায় আনা। এছাড়া, *মানহীন বিদ্যুৎকেন্দ্রের* ক্যাপাসিটি চার্জ বন্ধ করা দরকার, যেখানে বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো জ্বালানি সরবরাহ থাকা সত্ত্বেও উচ্চ প্ল্যান্ট ফ্যাক্টরে কার্যকরী হতে পারে না। এইসব বিদ্যুৎকেন্দ্রের চুক্তি পুনর্মূল্যায়ন বা বাতিল করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ক্যাপাসিটি চার্জ বন্ধ না করলে বিদ্যুৎ খাতে 'ডলার ড্রেনিং' বন্ধ করা কঠিন হবে, যা ভবিষ্যতে সরকারের উপর আরও বোঝা ফেলবে। 

২. নতুন কূপ খনন ও জ্বালানি অনুসন্ধান

বর্তমানে, সরকার কয়লা ও গ্যাস অনুসন্ধানে উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে, যেমন ৪ বছরে ১০০টি নতুন কূপ খনন। তবে, সরকারের এই উদ্যোগ কাগুজে না থেকে বাস্তবে পরিণত করতে হলে, বছরের মধ্যে ৫-৯টি নতুন কূপ খনন করা উচিত। শুধু উন্নয়ন কূপে নয়, সরকারকে অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে যে এই কূপগুলো অনুসন্ধান কূপ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে এবং কোন ধরনের কারিগরি জালিয়াতি না হচ্ছে। 

৩. কয়লাবিদ্যুৎ উৎপাদন ও সঞ্চালন ব্যবস্থা

দেশে কয়লাবিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা মূলত উপকূলীয় এলাকাগুলোর মতো স্থানে বেশি, তবে বিদ্যুৎ সঞ্চালন ব্যবস্থা অব্যবহৃত কিংবা অদক্ষতার কারণে পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না। *পায়রা*, *রামপাল*, *মাতারবাড়ী*, এবং *বাঁশখালী* তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ দ্রুত জাতীয় গ্রিডে পৌঁছানোর জন্য ৪০০ কেভি সঞ্চালন লাইন চালু করা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে, সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের অব্যবহৃত বা অলস যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে দ্রুত সঞ্চালন সক্ষমতা বাড়াতে হবে। 

৪. জ্বালানি অবকাঠামোর নিরাপত্তা

দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। সরকারকে জরুরি ভিত্তিতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থাকে *কী পয়েন্ট ইনস্টলেশন* হিসেবে চিহ্নিত করে সেগুলোর নিরাপত্তা জোরদার করতে হবে। সম্প্রতি বিভিন্ন দুর্ঘটনা যেমন *অগ্নিকাণ্ড* ও *নাশকতা* বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থায় বিরাট ঝুঁকি তৈরি করেছে। এই ধরণের ঘটনা বন্ধ করতে অবকাঠামোগত নিরাপত্তা ব্যবস্থা শক্তিশালী করা অত্যন্ত জরুরি। 

৫. দুর্নীতিবান্ধব ক্রয়প্রক্রিয়া সংস্কার

বিদ্যুৎ খাতের ক্রয় প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের দুর্নীতি এবং অপচয় চলছে। *সিপিটিইউ* নামের কেন্দ্রীয় ক্রয় কমিটির মাধ্যমে অযোগ্য সরবরাহকারীদের নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে, যার ফলে নিম্নমানের যন্ত্রপাতি বাজারে চলে আসছে। এর ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদনে খরচ বাড়ছে এবং বিদ্যুৎ সংকট আরও প্রকট হচ্ছে। তাই, সিস্টেমের মাধ্যমে *কালো তালিকা* তৈরি করে মানহীন সরবরাহকারীদের বাদ দিতে হবে। এছাড়া, বিদ্যুৎ খাতে অব্যবহৃত যন্ত্রপাতির ব্যবহার বাড়ানো দরকার।

৬. নিম্ন দক্ষতার বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ করা

বাংলাদেশে কিছু বিদ্যুৎকেন্দ্রের *জ্বালানি দক্ষতা* অত্যন্ত নিম্ন, যেখানে ৩০% জ্বালানি দক্ষতার বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো অধিক জ্বালানি পুড়িয়ে কম বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে। সরকারকে এই ধরনের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো বন্ধ করে, *উচ্চ দক্ষতার* কেন্দ্রগুলোর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। ৪০% বা তার বেশি জ্বালানি দক্ষতা এবং ৮০% প্ল্যান্ট ফ্যাক্টর থাকা কেন্দ্রগুলোকে সবার আগে সচল রাখা উচিত।

৭. শিল্প বিদ্যুতের খরচ কমানো

বর্তমানে শিল্পখাতে বিদ্যুতের উচ্চ মূল্য এবং নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহের অভাবে বহু শিল্প প্রতিষ্ঠান *ক্যাপটিভ* বিদ্যুৎকেন্দ্রে চলে যাচ্ছে। এটি একদিকে বিদ্যুৎ বিল বাড়াচ্ছে, অন্যদিকে ক্যাপটিভ কেন্দ্রগুলোতে ব্যবহৃত জ্বালানি অদক্ষভাবে পুড়ে বিদ্যুৎ উৎপন্ন হচ্ছে, যা পরিবেশ এবং অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর। সরকারের উচিত, সাশ্রয়ী শিল্প বিদ্যুৎ নীতিমালা প্রণয়ন এবং ক্যাপটিভ বিদ্যুৎ ব্যবহার কমাতে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ।

৮. সবুজ বিদ্যুৎ রোডম্যাপ বাস্তবায়ন

বাংলাদেশের সবুজ বিদ্যুৎ উৎপাদন এখনও খুবই কম, কিন্তু *ন্যাশনাল সোলার এনার্জি রোডম্যাপ ২০২১-৪১* অনুযায়ী, ২০৪১ সালের মধ্যে দেশের ২০ হাজার মেগাওয়াট সবুজ বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব। সরকারের উচিত, এই রোডম্যাপকে বাস্তবায়ন করতে দ্রুত কাজ শুরু করা এবং সৌরবিদ্যুৎ ও বায়ুবিদ্যুৎ উৎপাদনে অধিক গুরুত্ব দেওয়া। সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগের সুযোগ দেওয়ার জন্য নতুন *সোলার হোম* নীতি প্রণয়নও প্রয়োজন।

৯. বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের জন্য ইকোসিস্টেম তৈরি

বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী সংস্কৃতি গড়তে হলে প্রশাসনিক ব্যবস্থা, ব্যক্তি উদ্যোগ, এবং শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর অংশগ্রহণে একটি সমন্বিত *ইকোসিস্টেম* তৈরি করতে হবে। এতে *গণপরিবহন ব্যবস্থার উন্নতি*, *বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী যন্ত্রপাতি* ব্যবহারে উৎসাহ প্রদান, এবং *বিদ্যুৎ বিল* এর প্রণালী সাশ্রয়ী করতে হবে। শুধু কথায় নয়, পুরো সিস্টেমে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী উদ্যোগগুলি বাস্তবায়ন করতে হবে।

১০. জ্বালানি সাশ্রয়ের স্বচ্ছ পরিকল্পনা

বিদ্যুৎ, গ্যাস, তেল এবং অন্যান্য জ্বালানির *সিস্টেম লস* কমাতে এবং সাশ্রয়ী ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে সরকারের স্বচ্ছ পরিকল্পনা ও সঠিক হিসাবের ভিত্তিতে কাজ করতে হবে। দীর্ঘ সঞ্চালন লাইনে বিদ্যুৎ বা গ্যাসের সিস্টেম লস কমিয়ে, পুরো সিস্টেমকে আরো দক্ষ করতে হবে। 

সঠিক পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে সংকট কাটানো সম্ভব। সরকারের উচিত, এই পদক্ষেপগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন করে দেশের উন্নয়নকে এগিয়ে নেওয়া।


Post a Comment

1 Comments

  1. যুগোপযোগী পরিকল্পনা!!!

    ReplyDelete