খুচরা বাজারে আলুর দাম কেন বাড়ছে?
বাজারে এখন এক কেজি আলুর দাম ৭০ থেকে ৭৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা গত দুই সপ্তাহে প্রায় ১৫ টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে। এর মূল কারণ বিভিন্ন পক্ষ থেকে নানা ধরনের দাবি ও পরিস্থিতি।
একদিকে, ব্যবসায়ীরা বলছেন, বর্তমানে হিমাগারে থাকা আলুর সরবরাহ শেষ হয়ে আসছে এবং পাইকারি বাজারে চাহিদা মেটানোর মতো পর্যাপ্ত সরবরাহ নেই। অন্যদিকে, গত অক্টোবর মাসে অতিবৃষ্টি হওয়ায় কৃষকেরা আলুবীজ রোপণে দেরি করেছেন। ফলে আগাম আলুর সরবরাহ আসতে সময় নিচ্ছে, যা দাম বৃদ্ধির অন্যতম কারণ।
এছাড়া, গত দুই মাস আগে সরকার আলুর আমদানি শুল্ক কমিয়ে ২৫ শতাংশ থেকে ১৫ শতাংশে নামিয়ে দেয়। তাছাড়া, আলু আমদানির ওপর ৩ শতাংশ নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্কও প্রত্যাহার করা হয়। যদিও সরকার আশা করেছিল, এর ফলে বাজারে দাম কমবে, বাস্তবে তা ঘটেনি। বরং দাম বৃদ্ধি পেয়েছে।
হিমাগারে আলুর সরবরাহ সংকট
হিমাগার থেকে সরবরাহের সংকটও দাম বাড়ানোর পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। আলু সাধারণত হিমাগারে সংরক্ষণ করা হয়, কারণ সাধারণ তাপমাত্রায় এটি দীর্ঘদিন ভালো থাকে না। তবে, নভেম্বরের শুরুতেই নতুন আলু বাজারে আসা শুরু করে, এবং ডিসেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক হয়ে যায়। তবে এই সময়ের মধ্যে হিমাগারের আলুর সরবরাহ কমে যাওয়ায় দাম কিছুটা বেড়ে যায়।
তবে গত বছরের তুলনায় এ বছর আলুর দাম অনেক বেশি। গত বছর এই সময়ে কেজিতে আলুর দাম ছিল ৪৫-৫০ টাকা, যা এখন ৭০-৭৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এই দামে এক বছরের মধ্যে প্রায় ৪৭ শতাংশ বৃদ্ধি ঘটেছে।
কৃষকদের দেরিতে আলুবীজ রোপণ
এ বছর অক্টোবর মাসে অতিবৃষ্টির কারণে কৃষকেরা আলুবীজ রোপণে দেরি করেছেন, ফলে আগাম আলু বাজারে আসতে দেরি হচ্ছে। অন্যদিকে, কৃষকেরা ভালো দাম পাওয়ায় আগামী মৌসুমে আরও বেশি জমিতে আলু চাষে আগ্রহী হচ্ছেন। তবে, বীজ আলুর সংকট থাকায় তাঁরা এই বছর কিছু আলু খাবারের জন্য রাখাও বীজ হিসেবে ব্যবহার করছেন। এতে আলুর সরবরাহে আরো চাপ পড়ছে, যার কারণে দাম বাড়ছে।
আলু উৎপাদনের গরমিল
আলু উৎপাদনের সরকারি-বেসরকারি তথ্যে গরমিল রয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে আলুর চাহিদা ৯০ লাখ টন, তবে চলতি বছর আলু উৎপাদন হয়েছে প্রায় ১ কোটি ৩ লাখ টন। তবে হিমাগার মালিকরা দাবি করছেন, এ বছর আলু উৎপাদন হয়েছে ৭০ থেকে ৭৫ লাখ টন, যার ফলে চাহিদার তুলনায় ১০-১৫ লাখ টন আলুর ঘাটতি দেখা যাচ্ছে।
মজুতদারের দাপট
বাজারে আলুর দাম বাড়ানোর পেছনে মজুতদারদের ভূমিকা বড়। হিমাগার মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোস্তফা আজাদ চৌধুরী জানিয়েছেন, গত জুন মাসে হিমাগার থেকে প্রতি কেজি আলু ৪২-৪৫ টাকায় বিক্রি হলেও বর্তমানে এটি বেড়ে ৬২ টাকায় পৌঁছেছে। মজুতদাররা বাজারে বাড়তি চাহিদার সুযোগ নিয়ে দাম বাড়াচ্ছেন। গত বছর ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ও জেলা প্রশাসনের তদারকির কারণে মজুতদাররা এ ধরনের সুযোগ পায়নি, কিন্তু এ বছর তেমন কোনো অভিযান দেখা যায়নি।
নতুন আলু বাজারে আসবে শিগগিরই
এ বছর আলুর দাম বৃদ্ধির পেছনে বেশ কিছু কারণ থাকলেও, নতুন আলু আসতে শুরু করলে বাজারে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হতে পারে। সাধারণত নভেম্বরের শুরুতে নতুন আলু বাজারে আসতে শুরু করে এবং ডিসেম্বরের মধ্যে সরবরাহে কোনো সমস্যা থাকে না। তবে, এই সময়েও দাম কিছুটা বাড়তে পারে।
সব মিলিয়ে, আলুর দাম বৃদ্ধির পেছনে বিভিন্ন কারণ যেমন হিমাগারের সরবরাহ সংকট, অতিবৃষ্টি, এবং কৃষকের দেরিতে বীজ রোপণসহ মজুতদারদের ইচ্ছামতো দাম বাড়ানোর বিষয়টি রয়েছে।


1 Comments
সরকারকে এ বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন।
ReplyDelete