ইন্টারপোলের রেড নোটিশের মাধ্যমে কি শেখ হাসিনাকে ফেরত আনা সম্ভব?
বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক বাংলাদেশে ২০০৯-১০ সালের গণহত্যার অভিযোগে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে। এদিকে, শেখ হাসিনাসহ পলাতক আসামিদের ফেরত আনতে সরকার ইন্টারপোলের মাধ্যমে রেড নোটিশ জারি করার ঘোষণা দিয়েছে।
রোববার (১০ নভেম্বর) অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুল বলেন, "পলাতক ফ্যাসিস্ট চক্র পৃথিবীর যে দেশেই থাকুক, ইন্টারপোলের মাধ্যমে তাদের ধরে এনে বিচারের মুখোমুখি করা হবে।"
এদিকে, গত অক্টোবর মাসে ট্রাইব্যুনাল শেখ হাসিনাসহ পলাতক ৪৫ জনের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে এবং আগামী ১৮ নভেম্বরের মধ্যে তাদের আদালতে হাজির করার নির্দেশ দিয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, ইন্টারপোলের রেড নোটিশের মাধ্যমে শেখ হাসিনাসহ পলাতকদের ফেরত আনা সম্ভব কি না, এবং যদি সম্ভব হয়, তবে কবে এটি বাস্তবায়ন হবে?
রেড নোটিশ দিয়ে কীভাবে ফেরত আনা সম্ভব?
বাংলাদেশ পুলিশের পক্ষ থেকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম জানিয়েছেন, তারা রেড নোটিশের মাধ্যমে পলাতক আসামিদের ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া শুরু করেছে। নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ইন্টারপোল যদি আসামিদের অবস্থান জানতে পারে, তবে তারা সেই দেশের পুলিশকে সহযোগিতা করতে পারে এবং আসামিদের ধরতে সাহায্য করতে পারে।
ইন্টারপোলের মাধ্যমে দেশে ফেরত আনার প্রক্রিয়াটি মূলত রেড এলার্ট বা রেড নোটিশের মাধ্যমে শুরু হয়। সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক নূরুল হুদা বলেন, “রেড নোটিশ মানে শুধু একটি সতর্কতা, তবে এর মাধ্যমে কোনো দেশ যদি অপরাধীকে ফেরত দিতে না চায়, তখন আন্তর্জাতিক চাপ প্রয়োগ করা কঠিন হতে পারে।”
রাজনৈতিক ব্যক্তিদের ফেরত আনা কি সম্ভব?
ইন্টারপোলের রেড নোটিশের মাধ্যমে কাউকে ফেরত আনার বিষয়টি অত সহজ নয়। বিশেষত যদি ওই ব্যক্তি রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হন। এর আগে ২০১৫ সালে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বিরুদ্ধে রেড নোটিশ জারি করা হয়েছিল, কিন্তু আইনি লড়াইয়ের পর ২০১৬ সালে ইন্টারপোল তার নাম রেড নোটিশ তালিকা থেকে প্রত্যাহার করে নেয়।
সাবেক পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, ইন্টারপোলের রেড নোটিশ একটি সরঞ্জাম হলেও, রাজনৈতিক প্রতিরোধ, দেশের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি এবং দুই দেশের সম্পর্কের অবস্থা বিবেচনায় ফেরত আনা সহজ নয়। ২০১৩ সালে মুক্তিযুদ্ধের মানবতাবিরোধী অপরাধে আবুল কালাম আযাদের বিরুদ্ধে রেড নোটিশ জারি হয়েছিল, কিন্তু তাকে এখনো বাংলাদেশে ফেরত আনা সম্ভব হয়নি।
ইন্টারপোল কীভাবে কাজ করে?
ইন্টারপোল হল একটি আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা যা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের পুলিশ বাহিনী এবং অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মধ্যে সমন্বয় করে। এটি অপরাধীদের ধরতে বিভিন্ন দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সহায়তা করে। যখন কোনো ব্যক্তি অপরাধ করে অন্য দেশে পালিয়ে যায়, তখন ইন্টারপোলের সহায়তা নেয়া হয়। তবে রেড নোটিশ জারি করার জন্য অভিযুক্ত দেশকে প্রথমে অপরাধী সম্পর্কে সকল তথ্য এবং কাগজপত্র ইন্টারপোলের কাছে দিতে হয়, এরপর তারা সিদ্ধান্ত নেয়।
বাংলাদেশ-ভারত প্রত্যর্পণ চুক্তি
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ২০১৩ সাল থেকে একটি "বন্দি প্রত্যর্পণ চুক্তি" রয়েছে, যার মাধ্যমে অভিযুক্ত আসামি কিংবা বন্দিকে একে অপরের কাছে হস্তান্তর করা যায়। চুক্তির আওতায় রাজনৈতিক অপরাধে অভিযুক্তদের ফেরত নেয়ার বাধ্যবাধকতা নেই, তবে হত্যাকাণ্ড, নরহত্যা বা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের জন্য তাদের ফেরত আনা যায়।
ভারতের সাথে বাংলাদেশের বন্দি প্রত্যর্পণ চুক্তি হলেও, তা কার্যকর করার জন্য রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত এবং দুই দেশের সম্পর্কের ওপর নির্ভর করে। সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ূন কবির বলেন, “শেখ হাসিনাকে ফেরত আনার বিষয়টি শুধুমাত্র আইনি বিষয় নয়, রাজনৈতিকও বটে। বর্তমান বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের প্রেক্ষাপটে এটি একটি জটিল বিষয় হতে পারে।”
রাজনৈতিক ফ্যাক্টর
কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, যদি কোন দেশে আসামির বিরুদ্ধে রাজনৈতিক মামলার অভিযোগ থাকে, তাহলে সে দেশ রাজনৈতিক কারণে ফেরত দিতে না চাইলেও নানা ধরনের অজুহাত দেখিয়ে আবেদন নাকচ করতে পারে।
ইন্টারপোলের মাধ্যমে রাজনৈতিক ব্যক্তিদের ফেরত আনা অত্যন্ত কঠিন হতে পারে, কারণ আন্তর্জাতিক আইনে রাজনৈতিক আশ্রয় অথবা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে অপরাধীকে অন্য দেশের কাছে হস্তান্তর করার ক্ষেত্রে অনেক বিধি-নিষেধ রয়েছে।
সুতরাং, ইন্টারপোলের রেড নোটিশ এবং বন্দি প্রত্যর্পণ চুক্তি কোনো দেশের মধ্যে রাজনৈতিক মতামতের ওপর নির্ভর করে কাজ করতে পারে। শেখ হাসিনাকে ফেরত আনার বিষয়ে বাংলাদেশের সরকারের সিদ্ধান্ত এবং কূটনৈতিক লড়াই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।


2 Comments
Arrest her as soon as possible.
ReplyDeleteমনে হচ্ছে হাসিনা খালাকে দেশে ফিরিয়ে আনা একটু জটিলই হবে কারণ মোদি খালু কি তাকে সহজেই ছাড়বে???
ReplyDelete