অর্থনীতির শ্বেতপত্র প্রকাশ: ১৫ বছরে ৪০% এডিপি অর্থ লুটপাট
আওয়ামী লীগের শাসনামলে ২০০৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ১৫ বছরে দেশ থেকে ২৩৪ বিলিয়ন ডলার পাচার হয়েছে, যা স্থানীয় মুদ্রায় ২৮ লাখ কোটি টাকার সমান। এই অর্থ গত ৫ বছরে দেশের জাতীয় বাজেটের চেয়েও বেশি। প্রতিবছর গড়ে ১৬ বিলিয়ন ডলার বা ১ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা পাচার হয়েছে। অর্থাৎ, ১৫ বছরের এই পাচারের অর্থ দিয়েই ৭৮টি পদ্মা সেতু নির্মাণ সম্ভব। অর্থনীতির অবস্থা মূল্যায়নে গঠিত শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনটি তৈরি করেছেন বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডির বিশেষ ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য নেতৃত্বাধীন কমিটি। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, সবচেয়ে বেশি দুর্নীতি ঘটেছে ব্যাংকিং খাত, বিদ্যুৎ-জ্বালানি, উন্নয়ন প্রকল্প, শিক্ষা এবং স্বাস্থ্য খাতে। ২৯টি প্রকল্পের মধ্যে সাতটি বড় প্রকল্পের পরীক্ষা-নিরীক্ষায় দেখা গেছে, প্রতিটির ব্যয় ১০ হাজার কোটি টাকার বেশি বাড়ানো হয়েছে। প্রায় ৭০% ব্যয় বৃদ্ধি করা হয়েছে প্রকল্পের সুবিধা বিশ্লেষণ না করেই।
১৫ বছরে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) ৭ লাখ কোটি টাকার বেশি ব্যয় হয়েছে, যার ৪০ শতাংশ অর্থ আমলারা লুটপাট করেছেন। এ সময়ে দেশের মোট জিডিপির ৬% কর অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। যদি এই পরিমাণ অর্ধেক করা যেত, তাহলে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বাজেট দ্বিগুণ এবং তিনগুণ করা সম্ভব ছিল। বিদ্যুৎ উৎপাদনে ৩০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ হলেও এর ১০ শতাংশ অবৈধ লেনদেনের কারণে ৩ বিলিয়ন ডলার ক্ষতি হয়েছে।
কমিটি সুপারিশ করেছে, অর্থ পাচারে জড়িতদের আইনের আওতায় এনে বিচারকাজ শুরু করা হোক। প্রতিবেদনে ব্যাংকিং খাতকে সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত হিসেবে উল্লেখ করা হয়, বিশেষ করে নতুন ব্যাংকের লাইসেন্স, খেলাপি ঋণ, ঋণ নবায়ন এবং হলমার্ক, বেসিক ব্যাংকসহ অন্যান্য ঘটনা নিয়ে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যপুস্তকে এই শ্বেতপত্র অন্তর্ভুক্ত করার জন্য প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের মন্তব্য উঠে এসেছে। তিনি বলেছেন, "এটি ঐতিহাসিক দলিল এবং জনগণের সামনে এটি প্রকাশ করা উচিত।" তিনি আরও বলেন, "এই রিপোর্টে উঠে এসেছে কীভাবে চামচা পুঁজিবাদ অলিগার্কদের জন্ম দিয়েছে, যারা নীতি প্রণয়ন নিয়ন্ত্রণ করেছে।"
কমিটির সদস্যরা জানান, ২৯টি প্রকল্পের মধ্যে ৭টি বড় প্রকল্প পরীক্ষা করা হয়েছে, যার মোট ব্যয় ছিল ৮৭ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে ১ লাখ ১৪ হাজার কোটি টাকার প্রাথমিক ব্যয় থেকে ১ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছানো হয়েছে।
অর্থনীতির এই ভয়াবহ চিত্র প্রকাশের পর, গণমাধ্যমের ভূমিকা, সরকারের কর অব্যাহতি, বিদ্যুৎ খাতে দুর্নীতি এবং বড় প্রকল্পগুলোর ক্ষতিও তুলে ধরা হয়েছে। কমিটি বিশ্বাস করে, এই রিপোর্ট দেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ এবং এর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা জরুরি।


0 Comments