অর্থ পাচার করে বাংলাদেশের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত: নিউইয়র্ক টাইমস
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুরের মতে, শেখ হাসিনার ১৫ বছরের শাসনামলে বাংলাদেশ থেকে প্রায় ১৭ বিলিয়ন (১ হাজার ৭০০ কোটি) ডলার অর্থ পাচার হয়েছে। অন্য অর্থনীতিবিদদের মতে, পাচারের পরিমাণ ৩০ বিলিয়ন (৩ হাজার কোটি) ডলারেরও বেশি হতে পারে। নিউইয়র্ক টাইমসে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অর্থ পাচারের প্রকৃত পরিমাণ সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে বিভিন্ন আর্থিক হিসাব-নিকাশের ভিত্তিতে আহসান মনসুর দাবি করেছেন, শেখ হাসিনার শাসনামলে বাংলাদেশ ব্যাংক খাত থেকে যে পরিমাণ অর্থ লুট হয়েছে, তা পৃথিবীর আর্থিক ইতিহাসে এক নজিরবিহীন ঘটনা।
নিউইয়র্ক টাইমসে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শাসনামলে ব্যাংক খাতকে লক্ষ্য করে ব্যাপকভাবে অর্থ পাচার হয়েছে, এবং এতে বাংলাদেশের অর্থনীতির অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে। গভর্নর আহসান এইচ মনসুর বলেন, “সর্বোচ্চ রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষ বুঝতে পেরেছিল, লুটপাট করার জন্য সবচেয়ে ভালো জায়গা হচ্ছে ব্যাংক। বাংলাদেশের ব্যাংকগুলো ঋণ দিয়েছে এমন অনেক কোম্পানির অস্তিত্ব নেই, এবং এই ঋণের বড় অংশই কখনো ফিরে আসবে না।"
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের ব্যাংক খাত পুরোপুরি হাইজ্যাক করা হয়েছিল এবং গোটা প্রক্রিয়াটি একটি পদ্ধতিগত ডাকাতির মতো ছিল। আহসান মনসুর, যিনি আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলে (আইএমএফ) ২৭ বছর কাজ করেছেন, দাবি করেছেন যে এমন পরিস্থিতি পৃথিবীর অন্য কোনো দেশে তিনি দেখেননি।
এদিকে, বাংলাদেশের অর্থনীতির বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন। ভবিষ্যতে অর্থনীতি আরও সংকটে পড়বে বলে তার বিশ্বাস। তবে তিনি আশাবাদী যে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) বাংলাদেশের মুদ্রা স্থিতিশীল করতে তিন বিলিয়ন ডলার সহায়তা প্রদান করবে।
নিউইয়র্ক টাইমসে প্রকাশিত এই প্রতিবেদনে ইসলামী ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আব্দুল মান্নানের পদত্যাগের ঘটনাও তুলে ধরা হয়েছে। ২০১৭ সালের ৫ জানুয়ারি তিনি পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। জানা গেছে, তখন তাকে সামরিক গোয়েন্দা দপ্তরের প্রধান ফোন করে পদত্যাগের নির্দেশ দেন, যা সরকারের উচ্চ পর্যায়ের নির্দেশনার অংশ ছিল।
পাশাপাশি, এস আলম গোষ্ঠীও বাংলাদেশের ব্যাংক খাতের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে, এবং তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে যে তারা ঋণ দিয়েছিল নামেমাত্র কোম্পানিকে, যার বড় অংশই খেলাপি হয়ে গেছে।
অর্থ পাচারের ফলে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে যে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে, তা সবার কাছে স্পষ্ট। দেশের ব্যাংক খাত এখন প্রায় 'লাইফ সাপোর্টে' রয়েছে। অনেক ব্যাংকের অবস্থান এতটাই শোচনীয় যে তারা তাদের আমানতকারীদের টাকা ফেরত দিতে পারছে না, এবং বেতন পরিশোধেও সমস্যা দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে, নিম্ন আয়ের কর্মীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, এবং অনেক প্রতিষ্ঠানে ব্যাংক থেকে টাকা তোলা সম্ভব হচ্ছে না।
অর্থনীতির এই অবস্থা বাংলাদেশের মুদ্রার অবমূল্যায়ন, বিদ্যুৎ সংকট, এবং সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে আরও জটিল হয়ে উঠেছে। ২০১৪ সালের পর থেকে অর্থ পাচারের গতি বেড়েছে, এবং ২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর বাংলাদেশের মুদ্রার দরপতন আরও ত্বরান্বিত হয়েছে।
অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের জন্য সরকার কিছু পদক্ষেপ নিতে শুরু করলেও, সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা এবং দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কার্যকরী ব্যবস্থা নিতে হবে, যাতে অর্থনীতির ক্ষতি থেকে বাংলাদেশের বেরিয়ে আসা সম্ভব হয়।


1 Comments
অপরাধীদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা হোক!!!
ReplyDelete