প্রকল্প প্রস্তাবেই দুর্নীতি: শাস্তির অভাব ও দায় এড়ানোর সংস্কৃতি


পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের শাসন আমলে উন্নয়ন ও গণতন্ত্রের নামে প্রকল্প বাস্তবায়নে দুর্নীতি ছিল ওপেন সিক্রেট। প্রকল্প প্রস্তাবে অতিরিক্ত দাম ধরা, ভুল প্রস্তাব দেওয়া—এসব ঘটনা বছর জুড়ে চললেও দায়ীদের বিরুদ্ধে শাস্তির নজির নেই। ফলে একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটেছে বারবার।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, প্রকল্পে অতিরিক্ত ব্যয়ের প্রস্তাব করা একটি দুর্নীতির সূক্ষ্ম কৌশল। যারা এতে জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। প্রকল্প প্রস্তাব পরিকল্পনা কমিশনে আসার আগে বেশ কয়েকটি ধাপ পার হতে হয়, কিন্তু রহস্যজনক কারণে এসব অপকৌশল ধরা পড়ছে না। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান জানান, প্রকল্পে পণ্যের দাম বেশি ধরা দুর্নীতির শুরু। তবে দুর্নীতির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি, কারণ যাদের ব্যবস্থা নেওয়ার কথা, তারা ছিলেন এসবের অংশীদার।

সূত্র জানায়, প্রকল্প প্রস্তাবে একেকটি বালিশের দাম ধরা হয় ২৭ হাজার টাকা, ক্লিনারের বেতন ৪ লাখ টাকা এবং একটি স্যালাইন স্ট্যান্ডের দাম ৬০ হাজার টাকা। এসব প্রস্তাব পরিকল্পনা কমিশনের বৈঠকে চিহ্নিত হলেও অনেক সময় ফাঁকফোকর দিয়ে পার পেয়ে যায়। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি, কিছু ক্ষেত্রে শুধুমাত্র বদলি করা হয়েছে।

বিশ্বব্যাংকের সাবেক লিড ইকোনমিস্ট ড. জাহিদ হোসেন বলেন, দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেওয়া হয়েছে। যারা তথ্য প্রকাশ করেছে, তাদেরকেই দায়ী করা হয়েছে। তিনি মনে করেন, এসব অনিয়ম নিয়মে পরিণত হয়েছে, তাই এখন জিরো টলারেন্স দেখাতে হবে।

২০১৯ সালে ‘চট্টগ্রাম মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন’ প্রকল্পে একটি বালিশের দাম ২৭ হাজার ৭২০ টাকা প্রস্তাব করা হয়, যা সম্পূর্ণ অস্বাভাবিক। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে ফেরত পাঠানো হয় এমন ১২টি পণ্যের উদাহরণ দিয়ে, কিন্তু দায়ীদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

এছাড়া ‘বাংলাদেশ রেলওয়ের যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নে প্রস্তুতিমূলক কারিগরি সহায়তা’ প্রকল্পে ক্লিনারের মাসিক বেতন ৪ লাখ ২০ হাজার টাকা প্রস্তাব করা হয়েছিল। এসব অস্বাভাবিক ব্যয় নিয়ে চরম অসন্তোষ প্রকাশ করা হলেও দায়ীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা হয়নি।

সাবেক পরিকল্পনা সচিব মামুন-আল-রশীদ বলেন, পরিকল্পনা কমিশনের কাছে আসার আগে দায় এড়ানোর সংস্কৃতি প্রাধান্য পায়। মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থার কর্মকর্তারা একে অপরকে দোষারোপ করেন, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে সবাই দায়ী।

সাবেক পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান জানান, অতিরিক্ত ব্যয় প্রস্তাব কাম্য নয় এবং এসবের সঙ্গে যুক্তদের শাস্তির আওতায় নিয়ে আসা উচিত। দুর্নীতি বন্ধে সঠিক ব্যবস্থা নেওয়া না হলে বারবার একই ভুল হবে। 

এই প্রেক্ষাপটে স্পষ্ট যে, প্রকল্প প্রস্তাবে দুর্নীতি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়া হলে, বাংলাদেশের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড আরও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।