অন্তর্বর্তী সরকারের ১০০ দিন: প্রতিশ্রুতি পূরণে কতটুকু অগ্রগতি?
বাংলাদেশে শেখ হাসিনার সরকার পতনের পর ১০০ দিন আগে অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার এক নতুন যুগের সূচনা করেছিল। গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত এই সরকারের প্রতি সাধারণ জনগণের ছিল বিশাল প্রত্যাশা। তবে, সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর তিন মাসে বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রতিশ্রুতি পূরণের দিকে তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখা যায়নি। বিশেষ করে আইনশৃঙ্খলা, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ এবং অর্থনীতি সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোতে সরকারের কার্যক্রম নিয়ে জনগণের মাঝে হতাশা ও ক্ষোভ প্রকাশিত হচ্ছে।
রাষ্ট্র সংস্কারে সরকার কতটুকু অগ্রগতি দেখিয়েছে?
অন্তর্বর্তী সরকার রাষ্ট্র সংস্কারের বিষয়ে অনেক গুরুত্ব দিয়েছে, এবং বিভিন্ন কমিটি গঠন করা হয়েছে। সংবিধান, নির্বাচন ব্যবস্থা, পুলিশ, বিচার বিভাগ, দুর্নীতি দমন, এবং জনপ্রশাসন সংস্কারের জন্য ছয়টি কমিশন গঠন করা হয়। পরে এই তালিকায় আরো চারটি কমিশন যুক্ত করা হয়, যেগুলো স্বাস্থ্য, গণমাধ্যম, শ্রমিক অধিকার ও নারী বিষয়ক সংস্কারের জন্য কাজ করছে। তবে, এসব কমিশনের প্রতিবেদন আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে জমা দেওয়ার কথা থাকলেও, রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সরকারের আরও সক্রিয় ভূমিকা দরকার ছিল।
‘শেখ হাসিনার পতনের পর জনগণ দ্রুত কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন দেখতে চেয়েছিল, কিন্তু সরকারের অগ্রগতি সেভাবে স্পষ্ট হয়নি,’ বলেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. জোবাইদা নাসরীন।
দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে সরকারের ব্যর্থতা
একটি বড় চ্যালেঞ্জ ছিল দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ। আগের সরকারের সময় মূল্যস্ফীতি ঊর্ধ্বমুখী ছিল, আর নতুন সরকারের প্রতি জনগণের আশা ছিল যে দ্রব্যের দাম কমবে। কিন্তু বাস্তবে দাম বাড়তেই থাকে। বিশেষ করে তেল, চিনিসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে সরকার কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি। অক্টোবর মাসে সার্বিক মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ১০ দশমিক ৮৭ শতাংশ, যা আগের সরকারের সময়কার তুলনায় সামান্য কমলেও, বাজারে তার কোনো প্রভাব পড়েনি।
‘সরকার বাজার নিয়ন্ত্রণে সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ হয়েছে,’ বলেন ঢাকা শহরের বাসিন্দা শায়লা সুলতানা।
এদিকে, সরকারও স্বীকার করেছে যে কৃষিক্ষেত্রে বন্যার কারণে দাম বেড়েছে, তবে তারা আশাবাদী যে শিগগিরই দাম কমবে।
অর্থনীতি: কিছু উন্নতি, তবে চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে
অর্থনীতির দিক থেকেও কিছু অগ্রগতি দেখা গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ বৃদ্ধি পেয়ে ২০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। তবে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং ব্যাংক খাতের সমস্যা সমাধানে সরকারের পদক্ষেপ খুবই সীমিত বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
‘অর্থনীতি কিছুটা স্থিতিশীল হয়েছে, তবে মূল্যস্ফীতি এখনো বিরাট চ্যালেঞ্জ,’ বলেন অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি: সেনাবাহিনীর সহায়তা
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রথম ১০০ দিনে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ছিল এক বিশাল চ্যালেঞ্জ। আগস্ট মাসের পর সারা দেশে অপরাধ বৃদ্ধি পেয়েছিল এবং পুলিশের অনুপস্থিতি, বিশেষত রাতে, অপরাধীদের সাহসী করে তুলেছিল। ঢাকা শহরের অনেক এলাকা, বিশেষ করে মোহাম্মদপুর, ছিল অপরাধের কেন্দ্রস্থল।
এই পরিস্থিতি মোকাবেলায় সরকার সেনাবাহিনীকে মাঠে নামায় এবং একে বিশেষ নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের ক্ষমতা দেয়। সেনাবাহিনীর উপস্থিতি কিছুটা শান্তি ফিরিয়েছে, তবে আতঙ্ক এবং অপরাধের ঘটনা কমেনি।
নির্বাচন: সরকারের পরিকল্পনা
অন্তর্বর্তী সরকার নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কারের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, তবে সংস্কারের সময়সীমা এখনও স্পষ্ট হয়নি। সরকার বলছে, ‘সংস্কারের পর নির্বাচন হবে,’ তবে বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল দ্রুত নির্বাচন চাচ্ছে। প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ইউনূসের মতে, নির্বাচন কবে হবে তা সংস্কারের গতির ওপর নির্ভর করবে।
‘সংস্কারগুলো দ্রুত সম্পন্ন হলে নির্বাচন দ্রুত হবে,’ বলেন অধ্যাপক ইউনূস।
গণহত্যার বিচার
অন্তর্বর্তী সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার ছিল গত জুলাই-আগস্টের গণহত্যার বিচার। ইতোমধ্যে মামলার কার্যক্রম শুরু হলেও, বিচার প্রক্রিয়া সেভাবে এগোয়নি। বেশ কয়েকজন উচ্চ পদস্থ রাজনৈতিক নেতার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হলেও, তদন্তের গতি নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। নিহতদের পরিবারগুলোর জন্য সরকারি সহায়তার ব্যবস্থা শুরুর কথা বলা হলেও, প্রক্রিয়ায় বিলম্ব হচ্ছে।
সরকারের অবস্থান
অন্তর্বর্তী সরকার তিন মাসের কাজের অগ্রগতি তুলে ধরেছে। তারা বলছে, প্রশাসনিক সংস্কারে শান্তিপূর্ণ পরিবর্তন আনা সম্ভব হয়েছে, অর্থনীতি কিছুটা স্থিতিশীল হয়েছে এবং বন্যা মোকাবেলা করা হয়েছে। তবে দ্রব্যমূল্য, আইনশৃঙ্খলা এবং অন্যান্য খাতে সঙ্কট রয়ে গেছে।
‘আমরা চেষ্টা করছি, এবং আশা করি, আগামী কয়েক মাসের মধ্যে পরিস্থিতি অনেকটাই উন্নত হবে,’ বলেন খাদ্য উপদেষ্টা আলী ইমাম মজুমদার।
১০০ দিন শেষে, অন্তর্বর্তী সরকারের কাজের অগ্রগতি মিশ্র। কিছু ক্ষেত্রে তারা অগ্রগতি দেখাতে সক্ষম হলেও, জনগণের প্রত্যাশা পূরণে এবং স্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি করতে আরো সময় প্রয়োজন। সরকার এখন আশা করছে, আগামী কয়েক মাসে দেশের সমস্যাগুলোর সমাধানে আরও দৃশ্যমান পরিবর্তন আসবে।


1 Comments
আমাদেরকে একটু ধৈর্য্য ধারণ করতে হবে।এতদিনের বিশৃঙ্খলা এত দ্রুত সমাধান হবে না এটাই স্বাভাবিক!!!
ReplyDelete