বেক্সিমকো গ্রুপে ‘রিসিভার’ নিয়োগ, বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন পদক্ষেপ
বাংলাদেশ ব্যাংক বেক্সিমকো গ্রুপে ‘রিসিভার’ নিয়োগ দিয়েছে। এই রিসিভারের কাজ হবে বেক্সিমকো গ্রুপের সব প্রতিষ্ঠানের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা, বিশেষ করে কোম্পানির আর্থিক অবস্থা পরিচালনা এবং ঋণ পরিশোধের বিষয়টি খতিয়ে দেখা।
হাইকোর্টের আদেশের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ ব্যাংক, গ্রুপটির সব সম্পত্তি সংযুক্ত করে এই রিসিভার নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেয়। ৫ সেপ্টেম্বর হাইকোর্টের আদেশে বেক্সিমকো গ্রুপের সব সম্পত্তির ওপর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে এবং ঋণ পরিশোধের ব্যাপারে ব্যবস্থা নিতে বাংলাদেশ ব্যাংককে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।
হাইকোর্টের নির্দেশনার পর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক মো. রুহুল আমিনকে বেক্সিমকো গ্রুপের রিসিভার পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এই পদক্ষেপের ফলে, ব্যাংকগুলোর ঋণের পরিমাণ এবং বিদেশে পাচার হওয়া অর্থের বিষয়ে তদন্ত চলবে।
তবে, বেক্সিমকো গ্রুপ এই আদেশের বিরুদ্ধে আপিল করেছে এবং আজই শুনানি হওয়ার কথা রয়েছে।
বেক্সিমকো গ্রুপের ঋণ এবং আর্থিক সংকট
বেক্সিমকো গ্রুপ, বিশেষ করে বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস, বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্পগোষ্ঠী হিসেবে পরিচিত। তবে, গ্রুপটির ঋণের পরিমাণ সম্প্রতি ব্যাপকভাবে বেড়েছে। সরকারি-বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে বেক্সিমকোর ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে বেশ কয়েকটি ব্যাংকে বেক্সিমকো গ্রুপের বন্ডে বিনিয়োগ করা প্রায় ২ হাজার ৬১৬ কোটি টাকা রয়েছে।
করোনাভাইরাস মহামারীর পর থেকে গ্রুপটির ঋণ বৃদ্ধি পেতে থাকে, বিশেষ করে ২০২০ সালে যখন বেক্সিমকো করোনা টিকা সরবরাহের জন্য চুক্তি করে। এ সময় গ্রুপটির ঋণ প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়।
সালমান রহমান এবং অর্থপাচারের অভিযোগ
বেক্সিমকো গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান সালমান এফ রহমান, যিনি আগে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগবিষয়ক উপদেষ্টা ছিলেন, দীর্ঘদিন ধরে বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে আছেন। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি প্রায় ২০টি ব্যাংক থেকে ঋণের নামে অর্থ তুলে নিয়ে তা বিদেশে পাচার করেছেন। এসব অভিযোগের তদন্তের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক এবং সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন একাধিক নিয়ম শিথিল করেছে।
এদিকে, হাইকোর্টের আদেশে বেক্সিমকো গ্রুপের ঋণ এবং সম্পত্তি সংক্রান্ত বিষয়গুলো তদন্ত করা হবে। হাইকোর্টের আদেশ অনুসারে, গ্রুপের সব ব্যবসায়িক কার্যক্রমের বর্তমান অবস্থা এবং ঋণ পরিশোধের তথ্যও পরবর্তী চার সপ্তাহের মধ্যে জমা দিতে হবে।
অর্থ উদ্ধারে আন্তর্জাতিক সহায়তা
বাংলাদেশ ব্যাংক, অর্থ পাচার রোধে আন্তর্জাতিক আইনি সহায়তার দিকে নজর দিচ্ছে। ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে আলোচনা শুরু হয়েছে। বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) শিগগিরই এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর সম্প্রতি বলেন, "শেখ হাসিনার শাসনামলে সাবেক প্রশাসনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা প্রায় দুই লাখ কোটি টাকা পাচার করেছেন। এই অর্থ ফিরিয়ে আনা এবং সঠিক ব্যবস্থাপনায় আসা দেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।"
নগদ-এর ফরেনসিক নিরীক্ষা
বাংলাদেশ ব্যাংক তার পরিচালনা পর্ষদের এক সভায় ডাক বিভাগের ডিজিটাল আর্থিক সেবা ‘নগদ’-এর কার্যক্রম খতিয়ে দেখতে ফরেনসিক নিরীক্ষার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে জানানো হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের রিসিভার নিয়োগ এবং আন্তর্জাতিক সহায়তা নেওয়ার সিদ্ধান্ত বেক্সিমকো গ্রুপের ঋণ পরিশোধ এবং আর্থিক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তবে, বেক্সিমকো গ্রুপের বিরুদ্ধে ওঠা অর্থপাচারের অভিযোগ এবং ঋণ সমস্যা নিয়ে যেসব পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে, তা দেশে আর্থিক খাতের ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে দাঁড়াবে।


1 Comments
প্রশংসনীয় উদ্যোগ!!!
ReplyDelete