হাসিনাকে ভারতে না-রাখলেই দিল্লির জন্য ভালো অপশন হতো
বর্তমানে ভারত ও বাংলাদেশ সরকারের মধ্যে একটি বড় কূটনৈতিক অস্বস্তি তৈরি হয়েছে, আর তার অন্যতম কারণ হলো ভারতের মাটিতে শেখ হাসিনার উপস্থিতি। ৫ আগস্টের পর ভারত একাধিকবার জানিয়েছে, ২০১৪ সালের বাংলাদেশী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তখন "সাময়িক" আশ্রয় চেয়েছিলেন এবং সুরক্ষার কারণে তাকে এই আশ্রয় দেওয়া হয়। তবে বাস্তবতা হলো, জুলাই-অগাস্টের গণঅভ্যুত্থানে বাংলাদেশ সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভ এবং প্রতিবাদ ছিল, আর সেই সরকার এখন ভারতেই আশ্রয় নিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ওই অভ্যুত্থানটি ভারতের বিরুদ্ধেও ছিল, কারণ আন্দোলনকারীরা বিশ্বাস করতেন যে ভারতের সমর্থন ছাড়া শেখ হাসিনা এতদিন ক্ষমতায় থাকতে পারতেন না। অথচ ভারতই যখন তাকে আশ্রয় দিল, তখন বাংলাদেশে তা আরও বড় কূটনৈতিক সন্দেহ ও অবিশ্বাসের জন্ম দিয়েছে।
বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস ভারতের বার্তা সংস্থা পিটিআই-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ভারতকে খেয়াল রাখতে হবে যেন শেখ হাসিনা ভারতে বসে কোনো রাজনৈতিক বিবৃতি না দেন। ঢাকা কর্তৃপক্ষও ভারতের কাছে বারবার দাবি জানিয়েছে, শেখ হাসিনার বক্তব্যে যেন কোনো ধরনের অসুবিধা তৈরি না হয়, কিন্তু ভারতের পক্ষ থেকে তেমন কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
এছাড়া, শেখ হাসিনাকে বিচারের জন্য বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর কথাও উঠেছে। অস্থায়ী সরকারের একাধিক উপদেষ্টা ভারতকে এমন দাবি জানিয়েছেন, এবং দু’দেশের মধ্যে প্রত্যর্পণ চুক্তির কথাও তোলা হয়েছে। তবে অনেকের ধারণা, ভারত তাকে কখনো বাংলাদেশের হাতে তুলে দেবে না, যার ফলে কূটনৈতিক সম্পর্কের অবস্থা আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
ভারতের থিঙ্কট্যাঙ্ক আইডিএসএ-র সিনিয়র ফেলো এবং বাংলাদেশ বিশেষজ্ঞ স্ম্রুতি পট্টনায়ক প্রথম থেকেই মন্তব্য করে আসছেন যে, শেখ হাসিনাকে ভারতে না-রাখলেই দিল্লির জন্য সবচেয়ে ভালো অপশন হতো। তিনি বলেছেন, "যদি শেখ হাসিনা তৃতীয় কোনো দেশে চলে যেতে পারতেন, তাহলে সেটা দিল্লির জন্য সবচেয়ে ভালো সমাধান হতো। তবে, যেহেতু সেটা সম্ভব হয়নি, তাই এখন ভারতের সামনে আর কোনো উপায় নেই।"
এই পরিস্থিতির পরিণতি হলো, ঢাকার নতুন সরকারের সঙ্গে ভারতকে কূটনৈতিক সম্পর্কের মূল্যে দাম চোকাতে হবে। ‘দ্য ডিপ্লোম্যাট’ সাময়িকীতে পররাষ্ট্রনীতির বিশ্লেষক শ্রীরাধা দত্ত একটি নিবন্ধে লিখেছেন, "বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ভারত কখনো নাক গলায় না, এই ‘মিথ’টাকে বেআব্রু করে দিয়েছিল শেখ হাসিনাকে ভারতে আশ্রয় দেওয়ার ঘটনা।” এর ফলে ভারতের সমর্থনেই শেখ হাসিনা ক্ষমতায় টিকে ছিলেন—এই ধারণাটি এখন প্রায় নিশ্চিত হয়ে গেছে।
তবে, ভবিষ্যতে ভারত কি শেখ হাসিনাকে বিচারের জন্য বাংলাদেশের হাতে তুলে দিতে পারে? ভারতের সাবেক শীর্ষ কূটনীতিবিদ টিসিএ রাঘবন বিবিসি-কে বলেন, "এমন কোনো প্রশ্নই ওঠে না। প্রথমত, বাংলাদেশে তাকে সুষ্ঠু বিচার দেওয়া হবে এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। দ্বিতীয়ত, যদি ভারত তার সংকটের মুহূর্তে শেখ হাসিনার পাশে দাঁড়াতে না পারে, তাহলে প্রতিবেশী দেশগুলো ভারতকে কখনো আর বিশ্বাস করবে না।"
এখন, এটা পরিষ্কার যে শেখ হাসিনা হয়তো ভারতে দীর্ঘ সময়ের জন্য থাকবেন, এবং যতদিন পর্যন্ত তার অবস্থান এখানে থাকবে, ততদিন পর্যন্ত ঢাকার সঙ্গে দিল্লির কূটনৈতিক সম্পর্কের স্বাভাবিক হওয়া কঠিন হতে চলেছে।


0 Comments