উত্তরাঞ্চলজুড়ে তীব্র শীত: জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে শীত আগেই শুরু


বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে এই বছর শীতটি এসেছে অগ্রহায়নের শুরুতেই, যা জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবকে আরও স্পষ্ট করে তুলছে। বাতাসে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ কমে যাওয়ার ফলে, সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন তাপমাত্রা একে অপরের কাছাকাছি চলে আসায় রংপুরসহ এই অঞ্চলের ১৬ জেলায় এবার শীত শুরু হয়েছে স্বাভাবিক সময়ের ১৫ দিন আগেই। গত তিন দিন ধরে কুয়াশা ও ঠান্ডার কারণে দিনের বেলা সূর্যের দেখা মেলেনি। সন্ধ্যা হলেই কুয়াশার চাদরে ঢেকে যাচ্ছে বিস্তীর্ণ জনপদ। ফলে, শীতজনিত রোগের প্রাদুর্ভাবও শুরু হয়ে গেছে।

এ অবস্থাকে ‘ডেঞ্জার’ উল্লেখ করে আবহাওয়াবিদরা জানিয়েছেন, চলমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে এবার শীতের তীব্রতা অতীতের সকল রেকর্ড ছাড়িয়ে যাবে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই পরিস্থিতিতে উত্তরাঞ্চলের প্রায় পৌনে এক কোটি হতদরিদ্র মানুষ ভয়াবহ দুর্ভোগের সম্মুখীন হবেন।

উত্তরাঞ্চলে শীতের তীব্রতা বাড়ছে অগ্রহায়নের প্রথম থেকেই। জানানো হয়েছে, সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন তাপমাত্রা কাছাকাছি আসা এবং বাতাসে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ কমে যাওয়ায় শীত আগেভাগেই অনুভূত হতে শুরু করেছে। রংপুর আবহাওয়া অফিসের ওয়ারলেস অপারেটর মনজুর আলম জানান, গত ১০ দিনে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ১০.৫ থেকে ১৫.৫ ডিগ্রী সেলসিয়াসের মধ্যে ওঠানামা করেছে, এবং বাতাসের সর্বনিম্ন আদ্রতা ২২ শতাংশে নেমে এসেছে।

অন্যদিকে, বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন যে, যদি আবহাওয়া আরও পরিবর্তিত না হয়, তাহলে এই মাস এবং আগামী মাসের মধ্যে চারটি তীব্র শৈত্য প্রবাহ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, যার ফলে তাপমাত্রা তিন থেকে চার ডিগ্রী সেলসিয়াসে নেমে যেতে পারে।

এদিকে, এই অঞ্চলের অতিদরিদ্র মানুষের জন্য কোনো আগাম প্রস্তুতি নেওয়া হয়নি। সরকারি তথ্যমতে, এ অঞ্চলে অতিদরিদ্র মানুষের সংখ্যা প্রায় ২০ লাখ। তাদের অধিকাংশের শীত নিবারণের জন্য গরম কাপড় কেনার সামর্থ্য নেই, তাই তারা শীতের সময় সরকারি ও বেসরকারি সংস্থাগুলোর দেওয়া শীতবস্ত্রের ওপর নির্ভরশীল থাকে।

এছাড়া, সেন্টার ফর স্ট্যাটিসটিক্স অ্যান্ড ডেভলোপমেন্ট (সিএসডি) এর একটি জরিপে জানা গেছে, উত্তরের ১৬ জেলায় প্রায় পৌনে এক কোটি অতিদরিদ্র মানুষের বসবাস, যাদের বেশিরভাগই শীতের তীব্রতায় কষ্ট পায়। এর ফলে, প্রতি বছর শীতে তাদের মধ্যে মানবিক বিপর্যয় দেখা দেয় এবং প্রাণহানির ঘটনা ঘটে।

বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এবার শীতের তীব্রতা বহুগুণে বাড়তে পারে। এ বিষয়ে নয়া দিগন্তের সঙ্গে কথা বলার সময় ইন্টারন্যাশনাল রাইস রিসোর্স ইন্সটিটিউটের (IRRI) বাংলাদেশের কনসালটেন্ট ড. এমজি নিয়োগী বলেছেন, ‘‘এবার শীত দুই মাস আগেই এসেছে এবং শীতের তীব্রতা বাড়বে। সরকারের এখনই উত্তরাঞ্চলের জন্য পৃথক কার্যকর প্রকল্প গ্রহণ করা উচিত, না হলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে।"

রংপুর জেলার ত্রাণ কর্মকর্তা মোতাহার হোসেন জানিয়েছেন, সরকারি বরাদ্দ এখনও আসেনি, তবে চাহিদাপত্র পাঠানো হয়েছে। শীত মোকাবেলায় সরকারিভাবে কিছু শীতবস্ত্র বিতরণ করা হলেও, তা যথেষ্ট নয়। তবে, রংপুর বিভাগীয় কমিশনার শহিদুল ইসলাম জানিয়েছেন, শীঘ্রই শীতবস্ত্রের বরাদ্দ পাওয়া যাবে এবং প্রয়োজনে নগদ অর্থের মাধ্যমে স্থানীয়ভাবে শীতবস্ত্র কিনে বিতরণ করা হবে।

এই পরিস্থিতিতে, শীতজনিত রোগের প্রাদুর্ভাবও বেড়েছে। রংপুর, রাজশাহী, বগুড়া ও দিনাজপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল এবং অন্যান্য জেলা হাসপাতালগুলোতে শীতজনিত রোগীদের ভিড় ক্রমেই বাড়ছে। বিশেষ করে নিউমোনিয়া, সর্দি, কাশি, শ্বাসকষ্ট, মাথা ব্যথার মতো রোগীরা বাড়ছে। এতে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে বৃদ্ধ ও শিশুরা।

কৃষির ওপরও শীতের প্রভাব পড়েছে। বিশেষ করে আলু চাষিরা অতিরিক্ত শীতে হতাশ। শীতজনিত কারণে ধানের বীজতলা ও শাকসবজি বেড়ে উঠতে পারছে না, যা কৃষকদের জন্য বড় একটি সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এ অবস্থায়, উত্তরাঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রা আরও কঠিন হয়ে উঠেছে, এবং এই শীত মোকাবেলায় দ্রুত ও কার্যকর উদ্যোগের প্রয়োজন।