হাসিনার জন্য বিলাসবহুল অতিথিশালা: এখন শুধু বোঝা

চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর তলদেশে নির্মিত টানেল এখন আর শুধু প্রযুক্তির চমক নয়, বরং একটি বিতর্কিত আর্থিক সঙ্কট এবং অপ্রয়োজনীয় ব্যয়ের উদাহরণ হিসেবে আলোচনার কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। ২০২৩ সালের অক্টোবরে উদ্বোধন হওয়া এই টানেল নিয়ে শুরু থেকেই ছিল নানা সমালোচনা। বিশেষ করে প্রকল্পের ব্যয় বেড়ে যাওয়া এবং বিলাসবহুল অতিথিশালা নির্মাণের মতো সিদ্ধান্ত জনগণের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি করেছে।

এই টানেল প্রকল্পের আওতায় একটি অত্যন্ত বিলাসবহুল অতিথিশালা নির্মাণ করা হয়েছে, যার খরচ প্রায় ৪৫০ কোটি টাকা। অতিথিশালাটিতে রয়েছে পাঁচ হাজার বর্গফুট আয়তনের আধুনিক বাংলো, ৬টি কক্ষ, সুইমিংপুল এবং অত্যাধুনিক শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থা। এটি চট্টগ্রামের আনোয়ারা প্রান্তের পারকি খালের কাছে তৈরি করা হয়, যেখানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সম্ভাব্য সফরের জন্য অতিথিশালা তৈরি করা হয়েছিল। ধারণা ছিল, শেখ হাসিনা আনোয়ারায় গেলে এখানেই অবস্থান করবেন। তবে বাস্তবে এই অতিথিশালা কখনোই ব্যবহৃত হয়নি, এবং সেতু বিভাগের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এটি চালু করার মতো পর্যাপ্ত জনবল নেই।

বিশেষজ্ঞরা এই বিলাসবহুল অতিথিশালার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাদের মতে, এত ব্যয়সাপেক্ষ একটি স্থাপনা ছিল সম্পূর্ণ অপ্রয়োজনীয়। এছাড়া, টানেলের নির্মাণ প্রকল্পের আওতায় একটি সার্ভিস এরিয়া তৈরি করা হয়েছে, যার আয়তন ৭২ একর। এখানে অতিথিশালার পাশাপাশি রয়েছে ৩০টি বিশ্রামাগার, সম্মেলন কেন্দ্র, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, মসজিদ, পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস স্টেশন এবং শেখ মুজিবুর রহমানের স্মৃতিরক্ষা একটি জাদুঘর।

এদিকে, মাত্র দেড় কিলোমিটার দূরে পর্যটন করপোরেশন ৭৯ কোটি টাকা ব্যয়ে আরও একটি আধুনিক পর্যটন কমপ্লেক্স নির্মাণ করছে। এতে ১০টি সিঙ্গেল কটেজ, ৪টি ডুপ্লেক্স কটেজ, একটি বহুমুখী ভবন, হ্রদ এবং শিশুদের জন্য খেলার জায়গা থাকবে। এ অবস্থায়, টানেল প্রকল্পের অতিথিশালার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে।

বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, টানেলটি চালু হওয়ার পর আশানুরূপ যানবাহন চলাচল হয়নি। ২০২৩ সালের অক্টোবরে দৈনিক গড়ে মাত্র সাড়ে তিন হাজার যান চলেছে, অথচ প্রকল্প সমীক্ষায় বলা হয়েছিল, দিনে অন্তত ২০ হাজার যান চলবে। যান চলাচল কম হওয়ায় টানেল থেকে টোল আদায়ের পরিমাণও কম। মাসে গড়ে টোল আদায় হচ্ছে আড়াই কোটি টাকা, কিন্তু রক্ষণাবেক্ষণে প্রতি মাসে খরচ হচ্ছে প্রায় সাড়ে ১১ কোটি টাকা। এর ফলে, প্রতি মাসে প্রায় সাড়ে ৯ কোটি টাকার ঘাটতি হচ্ছে।

টানেল নির্মাণের প্রকল্প ব্যয় প্রথমে ছিল ৮ হাজার ৪৪৬ কোটি টাকা, কিন্তু জমি অধিগ্রহণ, শুল্ককর বৃদ্ধি এবং অন্যান্য কারণে তিন দফায় ব্যয় বাড়ানো হয়। শেষ পর্যন্ত প্রকল্পের মোট ব্যয় দাঁড়ায় ১০ হাজার ৬৮৯ কোটি টাকায়। এর মধ্যে অতিথিশালা এবং অন্যান্য অবকাঠামো যুক্ত করার জন্য ব্যয় বাড়ানো হয়েছে।

টানেলের লোকসান কমানোর জন্য সরকার কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে, যেমন চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার এবং বান্দরবানমুখী বাসের টানেল ব্যবহার নিশ্চিত করা, আনোয়ারা প্রান্তের সরু সড়ক সম্প্রসারণ এবং শিল্পায়ন ও আবাসন প্রকল্প বাস্তবায়ন। এছাড়া, অতিথিশালাটি বেসরকারি খাতে পরিচালনা করার পরিকল্পনা রয়েছে।

এ বিষয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক মইনুল ইসলাম মন্তব্য করেছেন, “কর্ণফুলী টানেল আগামী পাঁচ থেকে সাত বছর পর্যন্ত পুরোপুরি ব্যবহার হবে না। টোল থেকে যে আয় হবে, তা দিয়ে রক্ষণাবেক্ষণ খরচের এক-চতুর্থাংশও উঠে আসবে না।” তিনি এই টানেল প্রকল্পকে 'সাদা হাতি' হিসেবে উল্লেখ করেছেন। একই মতামত ব্যক্ত করেছেন ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মোহাম্মদ সোহাইব, যিনি বলেছেন, "এই প্রকল্পে যতটা পরিকল্পনা হয়েছিল, বাস্তবে ততটা কার্যক্রম বৃদ্ধি হয়নি, যার কারণে টানেল এখন বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।"

সাবেক এমপি ও চট্টগ্রাম মহানগরী জামায়াতের আমির শাহজাহান চৌধুরী অভিযোগ করেছেন, “এই টানেল নির্মাণ পরিকল্পনা ছিল অসংলগ্ন, এবং মূলত দুর্নীতির সুবিধার্থে জনগণের প্রয়োজনীয়তা অগ্রাহ্য করে এটি নির্মাণ করা হয়েছিল।”

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) চট্টগ্রামের সম্পাদক আখতার কবির চৌধুরী বলেছেন, “এই প্রকল্পের আর্থিক সঙ্কট এবং পরিকল্পনার ত্রুটিগুলি সরকারের জন্য বড় শিক্ষা হওয়া উচিত। ভবিষ্যতে আরো সুপরিকল্পিত পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন।”

বর্তমানে, টানেল প্রকল্পে কোনো সুস্পষ্ট সমাধান না আসা পর্যন্ত এটি শুধু আর্থিক ক্ষতির উদাহরণ হিসেবে রয়ে যাবে।